১৫ নভেম্বর ২০১৮ ১৭:১৩:১১
logo
logo banner
HeadLine
সম্প্রচার কমিশন গঠনে আইনের খসড়া অনুমোদন * ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনসহ সাত দফা দাবি সম্পাদক পরিষদের * ভ্রুন হত্যা বন্ধে জিরো টলারেন্স ও হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার কড়া নির্দেশ, তদন্তে গড়িমসি করলে শাস্তি * অসহায় বিএনপির ঐক্য প্রক্রিয়াই শেষ ভরসা * কামালের নেতৃত্বে ঐক্য বিএনপি-জামাতের রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র : মান্না-মাহি চৌধুরীর ফোনালাপ ফাঁস * খুনীদের সঙ্গে ঐক্য করেছেন ড. কামাল হোসেন গং, - পদ্মাসেতু র কর্মযজ্ঞ দেখতে গিয়ে আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী * দেশে মোট ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ * সেতুর নামফলক উন্মোচন ও রেলসংযোগ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করতে আজ পদ্মাসেতু এলাকায় যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী * বৃষ্টি আর জোয়ারে চট্টগ্রামের নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা * পাহাড় ও দেয়াল ধ্বসে চট্টগ্রামে নিহত ২ * বি চৌধুরীকে বাদ দিয়ে বিএনপির সঙ্গে নিয়ে কামাল-মান্নার জোট * সমুদ্রবন্দরসমূহে ৩ নং সতর্ক সংকেত বহাল, দমকা ও ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস * বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত * সেনাপ্রধান সম্পর্কে স্মরণকালের ভয়াবহ আজগুবি মিথ্যা তথ্য হাজির করেছেন বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী * বিশ্ব জুড়ে আগামী ৪৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকতে পারে ইন্টারনেট * বৃষ্টিসহ দমকা ও ঝড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা, ৩ নং সতর্ক সংকেত * তফসিলের প্রস্তাব নিয়ে বঙ্গভবনে যাচ্ছে ইসি * ৮০ ভাগ ট্যাপের পানিতে ক্ষতিকর ই-কোলাই ব্যাক্টেরিয়া * আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তি, ৩ নং সতর্ক সংকেত * ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে তিতলি, বন্দরসমূহে সংকেত কমিয়ে ৩ * ড. কামাল এখন তারেকের গডফাদার * জনপ্রিয়রাই পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন, বাদ পড়বে অর্ধশত মন্ত্রী-এমপি * ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তারেকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি * উড়িষ্যা ও অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করেছে ঘূর্ণিঝড় 'তিতলি * ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় : বাবর পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড, তারেক হারিচসহ ১৭ জনের যাবজ্জীবন * আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তি, ঘূর্ণিঝড় 'তিতলি' র প্রভাবে সমুদ্র বন্দরে ৪ নম্বর সর্তকতা * ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় আজ * ঘূর্ণিঝড় 'তিতলি'র প্রভাবে সাগর উত্তাল, ২ নং দূরবর্তী হুঁশিয়ারী সংকেত * একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় কাল * কার্যকর হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ ৬টি বিল, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর *
     10,2018 Wednesday at 09:26:22 Share

জনকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন

জনকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন

তোফায়েল আহমেদ : বাঙালী জাতির জীবনে ১০ জানুয়ারি চিরস্মরণীয় অনন্য ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭২-এর এই দিনটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করেছিল। যদিও ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়; কিন্তু বাংলার মানুষ স্বাধীনতার আস্বাদ উপলব্ধি করতে পারেনি। কারণ, যাঁর নেতৃত্বে এই দেশ, তিনি তখন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী। তিনি যতক্ষণ ফিরে না এসেছেন ততক্ষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় ১০ জানুয়ারি যেদিন জাতির পিতা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন সোনার বাংলায় ফিরে এসেছিলেন।


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অক্টোবর মাসে জাতির পিতার ফাঁসির আদেশ হয়। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয়ী হলে ইয়াহিয়া খান সেই আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। পাকিস্তানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর ইয়াহিয়া খানকে অপসারণ করে ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়। ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে আবেদন করেছিল, ‘আমার একটি স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে, সেটি হলো শেখ মুজিবকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো, আমাকে সেই সুযোগ দেয়া হোক।’ যে কারণে ভুট্টো মিয়ানওয়ালী কারাগারের জেল সুপার জনাব হাবীব আলীর কাছে বার্তা পাঠায় এবং বঙ্গবন্ধুকে মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে চশমা ব্যারার হাবীব আলীর বাসভবনে নিয়ে রাখা হয়। এরপর ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করে অনুনয়-বিনয় করে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সম্পর্ক রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করে। বঙ্গবন্ধু ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ভুট্টো ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরে পৌঁছান। পরদিন অর্থাৎ ৯ জানুয়ারি লন্ডনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু একটি বিবৃতি প্রদান করেন। ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলার মুক্তি সংগ্রামে স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এই মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে তখন আমি রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দী জীবন কাটাচ্ছি। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন ও সহযোগিতা দানের জন্য ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে আমি ধন্যবাদ জানাই। স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব সত্য। এ দেশকে বিশ্বের স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশ অবিলম্বে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য অনুরোধ জানাবে।’ পরিশেষে তিনি বলেন, ‘আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।’ বিবৃতির শেষে সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যে আপনার বাংলাদেশে ফিরে যাবেন সেই দেশ তো এখন ধ্বংসস্তূপ।’ তখন জাতির পিতা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমার বাংলার মানুষ যদি থাকে, বাংলার মাটি যদি থাকে, একদিন এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই আমি আমার বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত শস্যশ্যামলা সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করব।’


ঢাকায় যখন সাজ সাজ রব, তখন সকাল হতেই দিল্লীর রাজপথ ধরে হাজার হাজার মানুষের মিছিল পালাম বিমান বন্দর ও প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দিল্লীর জনসাধারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে এক অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। বিমান বন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান রাষ্ট্রপতি শ্রী ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট জেটটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অবতরণ করলে তাঁর সম্মানে ২১ বার তোপধ্বনি করা হয়। ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর পূর্বেই উপস্থিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ তাঁকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বলেন, ‘আপনার জন্য আমি গর্বিত। ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ আপনার জন্য গর্ব অনুভব করে। শেখ মুজিবকে আমাদের মাঝে পেয়ে ভারতের জনগণ আজ আনন্দে আত্মহারা। শেখ মুজিব তাঁর জনগণকে নতুন জীবন দান করেছেন। তাঁর স্বাধীনতার স্বপ্ন আজ সার্থক।’ দিল্লীতে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতিকালে লক্ষ্য মানুষের সমাবেশে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ভারতবাসীর উদ্দেশে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় বলেন, ‘আমার জন্য এটা পরম সন্তোষের মুহূর্ত। বাংলাদেশে যাওয়ার পথে আমি আপনাদের মহতী দেশের ঐতিহাসিক রাজধানীতে যাত্রাবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ কারণে যে, আমাদের জনগণের সবচেয়ে বড় বন্ধু ভারতের জনগণ এবং আপনাদের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী-যিনি কেবল মানুষের নন, মানবতারও নেতা। তাঁর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারের কাছে এর মাধ্যমে আমি আমার ন্যূনতম ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারব। এ অভিযাত্রা সমাপ্ত করতে আপনারা সবাই নিরলস পরিশ্রম করেছেন এবং বীরোচিত ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এ অভিযাত্রা অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দীদশা থেকে স্বাধীনতায়, নিরাশা থেকে আশায়। অবশেষে আমি নয় মাস পর আমার স্বপ্নের দেশ সোনার বাংলায় ফিরে যাচ্ছি।’ অভ্যর্থনার আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় বঙ্গবন্ধু একান্তে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ করেছিলেন, ‘ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে আমি ঋণী। আপনি আমার বাংলার মানুষকে অস্ত্র দিয়ে, অর্থ দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছেন; আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কঠিন দিনগুলোতে আপনি পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আপনার কাছে আমরা চিরঋণী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার নিকট আমার একটি অনুরোধ আপনি কবে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করবেন?’ শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী মহানুভবতার স্বরে বলেছিলেন, ‘আপনি যেদিন চাইবেন।’ বঙ্গবন্ধু এমন বিচক্ষণ নেতা ছিলেন যে, এরকম একটি অবস্থার মধ্যেও রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞায় ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়টি আলাপ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি আদায় করে নেন।


এরপর অবসান ঘটে আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার। দিল্লী থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট বিমানটি ঢাকার আকাশসীমায় দেখা দিতেই জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। দুপুর ১-৫১ মিনিটে ঢাকা বিমান বন্দরে বিমানটি অবতরণ করে। বিমানে সিঁড়ি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও অন্যান্য নেতা, আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ছুটে যাই নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে। আমার হাতে ছিল পুষ্পমাল্য। জাতির পিতাকে মাল্যভূষিত করার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সংযমের সকল বাঁধ ভেঙ্গে যায়, তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সে এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ, অভূতপূর্ব মুহূর্ত, যা আমার মানসপটে এখনও জ্বলজ্বল করেছে। বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনতার মহাসমুদ্রের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তাঁর চোখে তখন স্বজন হারানোর বেদনাভারাক্রান্ত অশ্রুর নদী, আর জ্যোতির্ময় দ্যুতি ছড়ানো মুখাবয়বজুড়ে বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি। বিমানের সিঁড়ি বেয়ে জাতির পিতা তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি সম্মান জানানো হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। চারদিক থেকে তাঁর ওপর পুষ্পবৃষ্টি হতে থাকে। বাংলাদেশ সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু সালাম গ্রহণ করেন।


এরপর রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যাওয়ার জন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপেক্ষমাণ ট্রাকে উঠে রওয়ানা দেই। সুদৃশ্য তোরণ, বাংলাদেশের পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দিয়ে সজ্জিত রাজপথের দু’পার্শ্বে দাঁড়ানো জনসমুদ্র পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট পর ময়দানে পৌঁছলাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল সাড়ে চারটা। চারদিকে লাখ লাখ অপেক্ষমাণ জনতা, কোনদিকে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আবালবৃদ্ধবনিতার মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত। ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ রণধ্বনিতে সবকিছু যেন ডুবে গেল। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠে চতুর্দিকে তাকালেন এবং রুমালে মুখ মুছলেন। বঙ্গবন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার কেবলই মনে হয়েছে জাতির পিতা জীবনভর এমন একটি দিনের অপেক্ষায়ই ছিলেন। দীর্ঘ কারাবাসের ক্লান্তিতে মলিন মুখটি তবু সমুজ্জ্বল। উন্নত ললাট, প্রশান্ত বদন, দু’চোখ তখনও অশ্রুসিক্ত, কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ। সে অবস্থায়ই চিরাচরিত ভঙ্গিতে ‘ভাইয়েরা আমার’ বলে উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দেশে নিবেদন করলেন তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতা। হৃদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে আবেগঘন ভাষায় বললেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালী, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ দীর্ঘ নয় মাস চৌদ্দ দিন নির্জন কারাগারে মৃত্যুর প্রহর গোনা একজন মানুষ কী করে এরকম উদ্বেলিত পরিস্থিতিতেও স্থির-প্রতিজ্ঞ থেকে বলছেন, ‘ভাইয়েরা, তোমাদের একদিন বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আজকে আমি বলি, আজকে আমাদের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঘরে ঘরে কাজ করে যেতে হবে।’ আরও বললেন, ‘সকলে জেনে রাখুন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের স্থান চতুর্থ।’ বক্তৃতায় তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোন ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবেÑ গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র।’ ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মদান স্মরণ করে বেদনা ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাংলায় আজ বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লাখ লোক মারা গেছে। আপনারাই জীবন দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে, এটাই ছিল আমার সাধনা।’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বলেন, ‘গত পঁচিশে মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসে বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ দেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। বিশ্বকে মানব ইতিহাসের জঘন্যতম কুকীর্তির তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এসব কুকীর্তির বিচার করতে হবে।’ পরিশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, “‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালী করে মানুষ করোনি।’ কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও তোমার বাঙালী আজ মানুষ হয়েছে।” লাখ লাখ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে এবং পরম পরিতৃপ্ত হয়েছে এই ভেবে যে, আজ থেকে আমরা প্রকৃতই স্বাধীন। সভামঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু ধানম-ির ১৮ নং বাড়িতে গেলেন, যেখানে পরিবারের সদস্যবৃন্দ অবস্থান করছিলেন। সেই বাড়ির সামনে আর একটি বাড়ি তখন তাঁর জন্য রাখা হয়েছিল। কেননা ধানম-ির ৩২ নং বাসভবনটি শত্রুবাহিনী এমনভাবে তছনছ করে দিয়েছিল যা বসবাসের অনুপযুক্ত ছিল। প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে ১১ জানুয়ারি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ১২ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন এবং আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করলেন। ১৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আমাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তাঁর রাজনৈতিক সচিব করেন। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় গণতন্ত্র।


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল-বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। আমাদের তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তাঁর প্রথম স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। আরেকটি স্বপ্ন যখন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলছিলেন তখনই বুলেটের আঘাতে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়। জাতির পিতাকে হারানোর দুঃখের মধ্যে ’৮১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে আমরা যে পতাকা তুলে দিয়েছিলাম সেই পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে আজকে তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। প্রতিপক্ষের শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে আর্থ-সামাজিক প্রতিটি সূচক আজ ইতিবাচক অগ্রগতির দিকে ধাবমান। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি; যুদ্ধবিধ্বস্ত ঘরে ঘরে ছিল খাদ্যাভাব। আজ দেশে ১৬ কোটি মানুষ এবং খাদ্যভা-ার পরিপূর্ণ। ’৭২Ñ’৭৩ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি ছিল ৩৪৮ মিলিয়ন ডলার; এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাপিয়ে গেছে। আগামীতে মহান বিজয় দিবসের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রাক্কালে তৈরি পোশাক খাতের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা আমরা স্থির করেছি ৫০ বিলিয়ন ডলার। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল না বললেই চলে-অর্থাৎ প্রায় শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করে আজ রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মাথাপিছু আয় যেখানে ছিল মাত্র ৫০-৬০ ডলার, আজ তা ১৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। আর পিপিপি (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি) অনুসারে ২০০০ ডলারের অধিক। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট মতে সামাজিক খাতের অগ্রগতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত থেকে এগিয়ে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘সামাজিক-অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। এমনকি সামাজিক কোন কোন ক্ষে

User Comments

  • কলাম