২৩ এপ্রিল ২০১৮ ০:১২:২১
logo
logo banner
HeadLine
আজ বিশ্ব ধরিত্রী দিবস * বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন তারেক রহমান! * ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে * রাজাকারের সন্তানদের চাকরিতে অযোগ্য ঘোষণার দাবি * শিশু ধর্ষণে মৃত্যুদণ্ডের আইন করছে ভারত * সন্দ্বীপে জামাত নেতাসহ ২ পলাতক আসামী গ্রেফতার * হালদায় ডিম ছেড়েছে মা মাছ, চলছে ডিম আহরণ ও রেণু ফোটানোর প্রক্রিয়া * হাজার হাজার কোটি টাকা রেমিটেন্স হিসেবে বিদেশী কর্মীরা নিয়ে যাচ্ছে * রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিন , রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধীদের বিচার করতে হবে -কমনওয়েলথ * আসছে মাসে এলএনজি পাবেন গ্রাহকরা * কোটা নিয়ে কথকতা! * সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনা * খুলেছে শ্রমবাজার, কর্মী নিয়োগে শীঘ্রই চাহিদাপত্র পাঠাবে আমিরাত * অতিক্রান্ত নববর্ষ ॥ সামনে সতর্কতা * সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে * সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে ৬ বাংলাদেশি নিহত * এশীয় অঞ্চলের ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীলতা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা * ৮-৪-৪-৪-৪-৮ * আমাদের উন্নয়ন ও স্বাধীনতার শত্রু-মিত্র * ঋণ জালিয়াতির মামলায় ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের পাঁচ কর্মকর্তার ৬৮ বছরের কারাদণ্ড * মুজিবনগর দিবসের স্মৃতিকথা * বাংলাদেশ সরকারের জন্ম কাহিনী * মুজিবনগর দিবস আজ * সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী * ৮ দিনের সরকারী সফরের প্রক্কালে দাম্মাম পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী * স্বাধীন মত প্রকাশ বন্ধে ডিজিটাল আইন করা হয়নি: জয় * টঙ্গীতে কমিউটার ট্রেন লাইনচ্যুত, নিহত ৫ আহত ৩৫ * বিতর্কিত এমপিদের তালিকা তৈরি করছে আওয়ামী লীগ * স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আসছে সব নাগরিক * আজ পবিত্র শবে মেরাজ *
     14,2018 Saturday at 10:40:14 Share

উপমহাদেশের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব

উপমহাদেশের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব

স্বদেশ রায় :: বাঙালী খুব উচ্চশিক্ষিত জাতি নয়; এমনকি উন্নত চরিত্রেরও নয়- বরং শঠতা, পরশ্রীকাতরতা, অলসতা ও কলহ প্রবণতাসহ নানা ত্রুটি বাঙালী চরিত্রে আছে। তার পরেও এই বাঙালী তার পথ চলাতে মাঝে মাঝে এমন কিছু কাজ করে বসে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালীকে অন্য এক উচ্চ আসনে বসিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ করে বলা যায়, বাঙালীর মধ্যে যেমন ভুল করে দু-একজন মানুষ জম্মে যায়, তেমনি বাঙালী মাঝে মাঝে কোন এক অদৃশ্য আত্মশক্তি বলে এমন দুই একটি কাজ করে বসে, যা আবার বাঙালী চরিত্রের সমস্ত হিসাব-নিকাশ বদলে দেয়।


বাঙালী চরিত্রের সমস্ত হিসাব-নিকাশ বদলে দেয়ার মতোই একটা কাজ ষাটের দশকে বাঙালীর সৃষ্টি পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করা। এই পহেলা বৈশাখ হালখাতাও নয়, এই পহেলা বৈশাখ পশ্চিমা বিশ্বের নিউ ইয়ার পালনও নয়। এই পহেলা বৈশাখের মর্মমূল খুঁজতে গেলে দেখা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতাকেন্দ্রিক যে বেঙ্গল রেনেসাঁ হয়েছিল, যার ফললাভ রবীন্দ্র-নজরুলসহ এক নবজাগরণ, একটি আধুনিক মানবগোষ্ঠী হওয়ার আত্মোপলব্ধি, পুরনো পশ্চাদপদ চেতনার স্থলে মানবিকতাকে প্রতিস্থাপন- তারই এক সারাৎসার নিয়েই যেন কলকাতায় নয়, ঢাকাতেই সূচনা হলো পহেলা বৈশাখ।


সন্জিদা খাতুনের নেতৃত্বে সেদিন যে ক’জন এই পহেলা বৈশাখকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন- তাদের শিক্ষায়, চেতনায় ও চরিত্রে বেঙ্গল রেনেসাঁর এই ফল ছিল পরিপূর্ণ রূপে। কলকাতার শিক্ষিত বাঙালী সমাজে যে তাদের মতো এমন উন্নত চরিত্রের মানুষ ওই সময়ে ছিলেন না তা নয়, তাদের থেকেও আরও বড় অনেকেই ছিলেন- যারা এঁদেরও শ্রদ্ধার। তার পরেও কেন ঢাকায় এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব- একটি রেনেসাঁর উত্তরাধিকারের যাত্রা শুরু হলো? তার কারণ ঢাকায় তখন ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে- আর কলকাতা তখন দ্বিধান্বিত একটি স্থান। ষাটের দশকে বাংলাদেশ স্বাধীন না হলেও, স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু না হলেও ঢাকাকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক একটি গোষ্ঠী ও তরুণ রাজনৈতিক শক্তি ততদিনে বাঙালীকে আলাদা করে ভাবতে শুরু করেছে। তাদের মনোজগতে তখন আর পাকিস্তান নেই। অন্যদিকে কলকাতার মনোজগতে তখন বৃহত্তর ইন্ডিয়া। তাই স্বাভাবিকভাবে বাঙালী নামক বাবুই পাখিটি তখন তার বাসা তৈরির নিপুণ শিল্পকর্মটি ঢাকাতেই করতে শুরু করেছে। আর বাবুই পাখিটির ওই নিপুণ শিল্পময় বাসাটিতে আলো প্রবেশের জন্যই যেন এক শিক্ষিত সংস্কৃত তরুণীর নেতৃত্বে যাত্রা হলো একটি আধুনিক জাতির আধুনিক উৎসব। আধুনিক জাতির যেমন কোন ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্ম থাকে না, তার সকল ধর্ম মানবকেন্দ্রিক ইহজাগতিক, আধুনিক উৎসবও তাই ইহজাগতিক।


এই আধুনিক পহেলা বৈশাখ আসার আগে বাঙালীর পূজা ছিল, ঈদ ছিল, মহরমের মিছিল ছিল, জন্মাষ্টমীর মিছিল ছিল, বুদ্ধ পূর্ণিমা ছিল, মেরি ক্রিসমাস ছিল- শুধু ছিল নয়, আজও আছে। এগুলো সবই ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্মের বর্ম দিয়ে ঘেরা। মানুষের এই ঈশ্বরকে মানুষ সকলের বলে বিলিয়ে দিলেও- ধর্মের নামে যার যার অংশ সে সে ভাগ করে নিতে এক মুহূর্ত বিলম্ব করেনি। ধর্মের নামে উৎসবকে যখন সকলে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে বা নেয়াই যখন অনিবার্য, তখন আধুনিক উৎসবের কাতারে সেগুলো আসতে পারে না। আর আসবেও বা কোন্ পথে? তাদের উৎস যে ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্ম! এই বাস্তবতায়, ধর্মের নামে ভাগ হওয়া একটি দেশের একটি প্রাদেশিক রাজধানীতে শিক্ষিত তরুণী-তরুণদের হাত ধরে শুরু হলো ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্মীয় উৎসবের বাইরে গিয়ে একটি নতুন সূর্যের আহ্বান- যেখানে রবির কিরণ সকলের ওপর সমানভাবে পড়বে। যেখানে মানুষে মানুষে বিভেদের কোন সুযোগ খোঁজার পথটি নেই। যে উৎসবে মানুষে মানুষের বিভেদ করা হয়, সে উৎসবের আনন্দ কখনই বড় হয় না, তার আচরণটিই বড়। আর ওই সব আচার-আচরণ এক সময়ে ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্ম পালনের অংশ হয়ে যায়। অন্যদিকে আধুনিক বা অসাম্প্রদায়িক উৎসবের ধর্ম হলো সে স্বয়ংক্রিয়, তার ভেতর একটা যোগ করার শক্তি থাকে। কারণ মৌলিক ধাতুর যেমন যোজনী থাকে সে কেবলই হাতে হাত ধরে, আধুনিক কোন উৎসব মানেই মানবসভ্যতার একটি মৌলিক উপাদান- তার যোজনী থাকবেই। সে একের পর এক যোজনা দিয়ে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হতে থাকে, সুন্দর থেকে সুন্দরতর হয়ে পরম সুন্দরের দিকে এগিয়ে যায়।


সন্জিদা খাতুনরা যেদিন একটি ফ্ল্যাটে বসে পহেলা বৈশাখ পালন শুরু করেন, সেদিন তারা জানতেন না যে, এই পহেলা বৈশাখের একটি স্মারক চিহ্ন হবে রমনার বটমূল। আবার রমনার বটমূল যখন বৃহত্তর হয়েছে, তখনও কেউ জানত না আরেক প্রজন্মের তরুণী-তরুণরা এসে এর সঙ্গে যোগ করবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। রমনার বটমূলের প্রভাতি উৎসব যখন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে যখন মঙ্গল শোভাযাত্রা, তখনও কেউ জানত না বিশ্বসভা স্বীকৃতি দেবে এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি মঙ্গল শোভাযাত্রার শুধু নান্দনিক দিকের জন্য নয়, মানবসভ্যতার মৌলিক উপাদান যে একটি অসাম্প্রদায়িক, একটি সকল মানুষের উৎসব- তারই প্রমাণ। তাই পহেলা বৈশাখ যে মানবসভ্যতাকে ভবিষ্যতমুখী করেছে, এ নিয়ে আর অন্য কোন ভাবনার অবকাশ নেই। বাঙালী যে ভবিষ্যতে একটি আধুনিক জাতি হবে, তারই ইঙ্গিত দিয়ে যায় পহেলা বৈশাখ। আর শুরুতে বাঙালী চরিত্রের যে দুর্বল বা কাদা মাখানো দিকগুলো উল্লেখ করেছি, তাও যে একদিন শেষ হবে, বাঙালী সত্যিকার আধুনিক জাতি হবে, সে ডাকও দেয় পহেলা বৈশাখ।


আজ এই আধুনিক উৎসবটির চারপাশ থেকে দেয়াল তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এ নিয়ে দুর্ভাবনার কোন কারণ নেই। এখানে যুদ্ধের আহ্বান আছে, তবে পহেলা বৈশাখকে হারানোর কোন ভয় নেই। কারণ, সভ্যতার সঙ্গে বর্বরতার এই যুদ্ধ মানব ইতিহাসের আরেকটি অংশ। সভ্যতার পথ কখনও মৃসণ নয়। অনেক চড়াই-উৎরাই তাকে পাড় হতে হয়। এই চড়াই-উৎরাইগুলো সভ্যতাকে ছেঁকে ছেঁকে খাঁটি সোনা তৈরি করে। সভ্যতার কোন উপাদানের চারপাশে যখন দেয়াল ওঠে, তখন তা ভেঙ্গে ফেলার দায়িত্ব কোন রাজণ্যের নয়Ñ তা ভেঙ্গে ফেলতে হয় মানুষকে। যেমন, সন্জিদা খাতুন থেকে শুরু করে সারাদেশের চারুকলার নাম না জানা তরুণীরা আজ মঙ্গল শোভাযাত্রার নানান প্রতীক তৈরি করছে, তেমনি আরও কোন তরুণী-তরুণরা আগামীতে ভেঙ্গে ফেলবে এ দেয়াল। আর এই অমঙ্গলের বিরুদ্ধে মঙ্গল শোভাযাত্রার যুদ্ধ করার জন্য কোন অস্ত্রাগারের অস্ত্রের দরকার হয় না। বুকের ভেতর যে আলো ও আনন্দ আছে, এই দুইয়ের শক্তিতেই ভেঙ্গে ফেলতে হবে তাদের পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার চারপাশে যে দেয়াল উঠছে, ওই দেয়ালকে। আগামীর তরুণী-তরুণরা তাদের আপন বুকের আনন্দ-আলো দিয়েই ভেঙ্গে ফেলবে সেটা। তখন আরও বড় হবে পহেলা বৈশাখ। হয়ত মঙ্গল শোভাযাত্রার থেকেও বড় কোন উপাদান যোগ হবে। আর সেদিন গোটা উপমহাদেশ তাকিয়ে দেখবে বাঙালীর ঘরের সূর্যটি সকলের থেকে বেশি আলো দেয়, বাঙালীর জ্যোৎস্না আরও বেশি মধুর। কারণ, যেখানে উৎসব খন্ড ক্ষুদ্রতার গন্ডি পার হয়ে সূর্যের আলোর মতো সকলকে রাঙিয়ে দেয়, সেখানে প্রাণের গতি হয় দুর্বার। আর সে প্রাণ মানবের। যুগে যুগে সভ্যতা দানবকে পরাজিত করে এই মানবের উত্থানই তো চায়। (জনকন্ঠে প্রকাশিত)।

User Comments

  • কলাম