১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ ১:২৩:৫৯
logo
logo banner
HeadLine
আসন্ন নির্বাচন এবং সৎ সাংবাদিকতার দায়িত্ব * ৫৮ নয়, ৫৪টি নিউজ পোর্টাল ও লিংক বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বিটিআরসি * একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : মোট প্রার্থী ১৮৪১, দলীয় ১৭৪৫, স্বতন্ত্র ৯৬ * বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করেই কাল থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারে নামছে আওয়ামী লীগ * একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে লড়বেন যারা * প্রতিক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হচ্ছে আজ * টেস্টের পর ওয়ানডেতেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দাপুটে জয় দিয়ে শুরু করল টাইগাররা * বিএনপি ২৪২ অন্যদের ৫৮ * আওয়ামীলীগ ২৫৮, জাপা ২৬টিতে জোটগত ১৩২টিতে উন্মুক্ত, মহাজোটের অন্যান্য শরিকরা ১৬টিতে লড়বেন * প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষ হচ্ছে আজ * বাংলাদেশ সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সক্ষম - চীনা রাষ্ট্রদূত * মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগে বিএনপির পল্টন, গুলশান অফিসে হামলা ও তালা মেরে দিল বঞ্চিতরা * জনগণকে উন্নয়নের কথা বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে - প্রধানমন্ত্রী * জাতীয় পার্টির ৩৯ প্রার্থীর হাতে মহাজোটের চিঠি ৪ জন লড়তে পারেন লাংগল নিয়ে, অন্য শরীকদের জন্য ১৭টি আসন * দ্বৈত মনোনয়নের ১৭ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত * বিএনপির ২০৬ আসন চুড়ান্ত, বাকি ৯৪ টিতে শরিকদের প্রার্থী ঘোষণা আজ * প্রশিক্ষণ কাজে মেধাবীদের নিয়োগ দেয়া উচিত - প্রধানমন্ত্রী * ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাত লাখ সদস্য * ১০ বছরে আওয়ামীলীগের উন্নয়ন ২০ লাখ কোটি টাকা * ইকোনমিস্টের মতে আওয়ামী লীগ নিশ্চিত ক্ষমতায় আসছে * নির্বাচন পর্যন্ত কি ভালোয় ভালোয় দিনগুলো কাটবে? * নাইকো দুর্নীতি মামলায় স্বাক্ষ্য দিতে আসছে মার্কিন এফবিআই ও কানাডীয় আরসিএমপি, অগ্রবর্তী দল ঢাকায় * ১১ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করবে আওয়ামীলীগ, আত্মবিশ্বাসী বিদ্রোহ দমনে'ও * আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বন্ধুহীন বিএনপি * ভিকারুননিসার বরখাস্ত তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে র্যা ব-পুলিশকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রনালয় * আজ সন্ধ্যায় প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা হতে পারে: মির্জা ফখরুল * ছাত্রী আত্মহত্যার জের, ভিকারুননিসার ৩ শিক্ষককের এমপিও বাতিলসহ বরখাস্তের নির্দেশ * টঙ্গীতে ইজতেমা ময়দানে সংঘর্ষের ঘটনায় শুক্রবার সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে সম্মিলিত ওলামায়ে কেরাম ও সর্বস্তরের তৌহিদী জনতা * আজ আপিলের শেষ দিন, চট্টগ্রামে আপিল করেছেন ১০ জন বাকিরা আজ করবেন * ক্রিকেট ও রাজনীতি : মাশরাফির ভাবনা *
     17,2018 Tuesday at 10:06:43 Share

বাংলাদেশ সরকারের জন্ম কাহিনী

বাংলাদেশ সরকারের জন্ম কাহিনী

লে. কর্নেল এটিএম মহিউদ্দিন সেরনিয়াবাত (অব) :: ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সাল। সেদিন ছিল শনিবার। তখনও প্রভাতের সূর্য মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় দৃশ্যমান হয়নি। তবুও জেগে উঠেছে এখানকার মানুষ। কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হলেও গতকাল বিকেলে দু’জন বিএসএফ অফিসারসহ স্থানীয় এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরী ও ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আহমেদের আগমন, মঞ্চের স্থান নির্বাচন, নিরাপত্তা বিষয়ের আলাপচারিতায় মানুষ বুঝে গিয়েছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে এই নিভৃত আন্নকাননে। আজ অন্ধকার কাটার আগেই পুনরায় ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থানীয় নেতা হেবা ডাক্তারসহ বেশ কিছু অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা উপস্থিত হয়ে জানান দিল- এখানে সকাল দশটায় জনসভা হবে। শপথ গ্রহণের বিষয়টি তখনও গোপন রাখা হয় নিরাপত্তার স্বার্থে। এই সকালে পুলিশের ইউনিফর্মধারী মাহবুবউদ্দিন আহমেদ কি যেন নির্দেশনা দিলে অস্ত্রধারীরা বেশ এলাকাজুড়ে বহির্মুখী অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মঞ্চের জন্য নিকটস্থ বাড়ি থেকে গোটা চারেক চৌকি এবং ক’টি চেয়ার নিয়ে আসা হয়েছে। গ্রামের দিকে তাক করা দুটি মাইকে জনসভার প্রচার শুরু হলে যতদূর আওয়াজ যায়, মানুষ এদিকে ছুটতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জীপ গাড়িতে উপস্থিত হলেন ইপিআরের মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ও তার স্ত্রী নাজিয়া ওসমান। এখানে উল্লেখ্য যে, ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী আক্রমণ শুরু করলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনগণের সঙ্গে সামরিক, ইপিআর, পুলিশ বাহিনীর বাঙালী সদস্যরাও রুখে দাঁড়িয়েছে। এই অঞ্চলে অর্থাৎ যশোরে হানাদাররা অবরুদ্ধ, কুষ্টিয়ায় পর্যুদস্ত। চুয়াডাঙ্গায় মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ইপিআর নিয়ে বিদ্রোহ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দক্ষিণ-পশ্চিম কমান্ড ঘোষণা করেছেন। কৌতুক মনে হলেও সত্যি- যুদ্ধে তাকে সহায়তার জন্য স্থানীয় এসডিও তৌফিক এলাহী ও এসডিপিও মাহবুবউদ্দিনকে আত্মায়িক ক্ষমতা বলে মেজর ওসমান ক্যাপ্টেন র‌্যাঙ্ক পরিয়ে দিয়েছেন। তারাও সগৌরবে তা গ্রহণ করেছেন। তারা নিজেরা সিলমোহর তৈরি করে এত দ্রুত সময়েই সেখানে স্বাধীন বাংলার নতুন প্রশাসনও চালু করেছিলেন, যা আজ অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।


সকাল দশটার কিছু পরে বিএসএফ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র প্রহরায় প্রায় শ’খানেকের বিশাল একটি গাড়িবহর সীমান্ত অতিক্রম করে বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননে এসে পৌঁছল। গাড়ি থেকে নেমে এলেন আওয়ামী লীগ হাই কমান্ডের নেতৃবৃন্দ, এমএনএ-এমপিএ, ভারত-বাংলাদেশ ছাড়াও শরণার্থীদের সংবাদ কভারেজের জন্য কলকাতায় আগত বিদেশী অনেক সাংবাদিক। নেতাদের দেখা মাত্র উপস্থিত জনতার গগনবিদারী স্লেøাগানে আশপাশের দু’চার গ্রাম কেঁপে উঠল। মঞ্চে উঠে এলেন শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ছাড়াও এমএনএ কর্নেল (অব) ওসমানী। তাকে প্রথম দৃষ্টিতেই আজ একটু বেখাপ্পা লাগছে। কেননা পাক হানাদার বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেয়ার জন্য ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা ছাড়ার আগে তার মুখশ্রীর সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিশালাকারের গোঁফটি বিজর্সন দিয়ে আসতে হয়েছে। সভা শুরু হলো। পরিচালনা করছেন টাঙ্গাইলের এমএনএ আবদুল মান্নান। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেফতারের পূর্বে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণাকে ভিত্তি করে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম এই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র তৈরি করেন। এরপর মন্ত্রিপরিষদের নাম ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানে কারাগারে আটক। কিন্তু তারপরও তিনি যে বাঙালী জাতির ঐক্যের প্রতীক, সকল শক্তি ও সাহসের আধার। শারীরিকভাবে তিনি অনুপস্থিত থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়ে তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করেই লড়তে হবে। এমন বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুকে নতুন এই সরকারের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমনটি বিরল। তাঁর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক, কামরুজ্জামান মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। খুবই ক্ষুদ্র মন্ত্রিসভা। সেনাপতি হিসেবে ছোটখাটো অথচ এককালের ব্রিটিশ আমলের জাঁদরেল, পেশাদার সেনা অফিসার দলীয় এমএনএ কর্নেল (অব) এমএজি ওসমানীর নাম ঘোষণা করা হলে খাকি ইউনিফর্ম ও ব্যারেট পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে মিলিটারি কায়দায় তিনি জনতার উদ্দেশে সালাম জানান। শপথ গ্রহণ শেষে নতুন সরকারকে ক্যাপ্টেন (এসডিপিও) মাহবুবউদ্দিনের নেতৃত্বে আনসার বাহিনীর একটি দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। এখানেই বৈদ্যনাথতলাকে মুজিবনগর নামকরণ করা হয়। বেলা দুটো নাগাদ মন্ত্রিপরিষদ, অন্যান্য অতিথি ও সাংবাদিক সকলে স্থান ত্যাগ করেন। মেজর আবু ওসমান, তার দুই তরুণ ডেপুটি তৌফিক এলাহী চৌধুরী ও মাহবুবউদ্দিন সব শেষে নিরাপত্তা দল নিয়ে মুজিবনগর ছাড়লেও নিয়ে যান এক গৌরবময় ইতিহাসের স্মৃতি, যার জন্য হাজার বছর অপেক্ষা করেছিল আমাদের পূর্ব পুরুষরা। যারা যুগের পর যুগ অত্যাচারিত হয়েছিল আর্য, পাল, সেন বংশ, তুর্কী-খালজি-সুলতান, হাবসি-হুসেন শাহী-পর্তুগীজ-পাঠান-মুঘল ও ইংরেজ বর্গীসহ আরও অনেক শাসকের কাছে।


পূর্বসূত্র ও প্রেক্ষাপট : ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে এই অঞ্চলের বাঙালী মুসলমানদের একটি বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু শুরুতেই পরিষ্কার হয়ে যায়Ñ স্বাধীন হলেও মুক্তি মেলেনি তাদের। পূর্বের শাসকেরা অত্যাচারী ছিল ঠিকই, কিন্তু নব্য শাসকগোষ্ঠী বাঙালীদের অত্যাচার তো বটেই, ঘৃণা-তাচ্ছিল্য, এমনকি কথায় কথায় হাভাতে বাঙালী ও কনভার্টি মুসলিম বলতেও দ্বিধা করত না। ফলে বাঙালীদের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। ’৫২, ’৫৪-এর ইতিহাস ও ’৫৮ সাল থেকে সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর এই ক্ষোভকে তীব্রতর করে। ’৬৬ সালে শেখ মুজিবের ছয় দফাকে ক্ষুব্ধ মানুষেরা মুক্তি সনদ মেনে লুফে নেয়। ফলে পরবর্তীতে সত্য কি মিথ্যা প্রমাণের পূর্বেই শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক মুজিবের বিরুদ্ধে আনীত আগরতলা মামলা তাদের জন্যই বুমেরাং হয়ে যায়। ’৬৯ সালে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের ফলে শেখ মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তি তাঁকে পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিতে মহানায়ক বানিয়ে দেয়। তিনি হয়ে যান ‘বঙ্গবন্ধু’। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে জনগণের ভোটে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর যোগ্যতা অর্জন করেন। কিন্তু গণরায়ই তো আর চূড়ান্ত নয়। শাসকগোষ্ঠী অনুমান করতে পারে যে, শেখ মুজিবের মূল লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী নয়। তিনি তাঁর পূর্বাঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা মাত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। অতএব, কোনমতেই ক্ষমতা হস্তান্তর নয়। আগামী কয়েক দশক যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এমন প্রস্তুতি নিয়ে ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর হামলে পড়ে। তাঁকে হাতে না পেলে পাকবাহিনী ঢাকার মানুষকে আর জ্যান্ত রাখবে না এমন চিন্তা থেকে বঙ্গবন্ধু নিজে গা-ঢাকা না দিলেও দলীয় নেতাকর্মীদের আত্মগোপনে এবং ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার নির্দেশ দেন। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম প্রদত্ত তথ্য মতে রাত এগারোটায় বিদায় নেয়ার সময় বঙ্গবন্ধু হাসিমুখে উচ্চারণ করেন- ‘আমাকে ওরা হত্যা করলেও আমার ঠোঁটের কোনায় এই হাসি স্পষ্ট দেখতে পাবে, কেননা আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’ সেই রাতে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুর মুখে রেখে তাজউদ্দীন আহমদ একবুক হতাশা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। কাঁধে ঝোলানো একটি ব্যাগে এক সেট কাপড় পুরে পায়ে কেডস ও পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবিতেই দ্রুত ঘর ছাড়েন। মার্চের ২৫ ও ২৬ তারিখ যখন গুলি এবং একই সঙ্গে আগুন জ্বলছিল গুপ্তাশ্রয়ে অবস্থানরত তাজউদ্দীন তখন পেছনে রেখে আসা পরিবার অপেক্ষা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্য নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। ২৬ তারিখ দুপুরে লালমাটিয়ার আঃ গফুরের বাড়িতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় বেতার ভাষণে উন্মাদ ইয়াহিয়ার দম্ভোক্তি ‘শেখ মুজিব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাকে এবার বিনা শাস্তিতে যেতে দেয়া হবে না’ শোনা মাত্র তাজউদ্দীন চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠেন।


২৭ মার্চ কিছু সময়ের জন্য কার্ফু প্রত্যাহার করা হলে সঙ্গী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে তাজউদ্দীন বেরিয়ে পড়েন। রায়েরবাজারের পর নবাবগঞ্জ পথে পিঁপড়ার মতো ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। তারাও মিশে গেলেন ওই কাফেলায়। সারাদিন হেঁটে সন্ধ্যায় দোহার। পরদিন আবার যাত্রা। পদ্মা পাড়ি দিয়ে অধিকাংশ পথ হেঁটে কিছুটা রিক্সা-বাসে ফরিদপুর হয়ে মাগুরা। হাঁটুতে প্রচ- ব্যথা, পায়ে ফোসকা, ক্লান্ত শরীর। রাতটা এখানে কাটিয়ে সকালে আবার যাত্রা। একটি জীপ পেয়ে সহসাই ঝিনাইদহে আওয়ামী লীগের আঃ আজিজের বাড়িতে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক। এখান থেকে ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবউদ্দিনকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় মেজর আবু ওসমানের কমান্ড হেডকোয়ার্টারে। সময় দ্রুত এগিয়ে চলছে। এবার সীমান্ত পাড়ি দেয়ার টার্গেট। তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলাম এবার সঙ্গে নিলেন তৌফিক এলাহী চৌধুরী ও মাহবুবউদ্দিনকেও। সন্ধ্যার আঁধার যখন ধরণীকে কোলে তুলে নিয়েছে তখন তারা সীমান্তের এপারে একটি কালভার্টের ওপর অপেক্ষমাণ। বিশেষ দূত হিসেবে শেষোক্ত দু’জনকে ওপারে পাঠানো হয়েছে বিএসএফের চৌকিতে আলোচনার জন্য। দূতদ্বয় বিএসএফের চৌকিতে ক্যাপ্টেন মহাপাথ্বরের কাছে বাংলাদেশের দুই শীর্ষ নেতার আগমনের খবর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেয়ার অনুরোধ জানান। এত বড় ব্যাপার হ্যান্ডল করার মতো জ্যেষ্ঠতা ক্যাপ্টেনের নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে শরণার্থীর ¯্রােত ও এখানকার অবস্থা জানার জন্য বিএসএফের পূর্বাঞ্চল অধিনায়ক ওই দিন কাছেই কোন শিবিরে অবস্থান করছিলেন। ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিক তাকে জানালে অধিনায়ক গোলক মজুমদার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দেন। মহাপাথ্বর ওই দূতদ্বয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ এলাকায় প্রবেশ ও যথাযথ সম্মান জানিয়ে জনাব তাজউদ্দীন ও তার সঙ্গীকে তাদের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বিএসএফ চৌকিতে নিয়ে যান। ওই রাতেই বিএসএফের গোলক মজুমদার উপস্থিত হয়ে এই দুই অতিথিকে নিয়ে কলকাতায় রওনা হন।


৩১ মার্চ বিএসএফ প্রধান শ্রী রুস্তমজী বাংলাদেশ নেতৃদ্বয়ের সঙ্গে কলকাতায় সাক্ষাত করেন। সাক্ষাতকালে তাজউদ্দীন আহমদ অন্য কারও নয়, সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। ১ এপ্রিল রাতে বাংলাদেশের দুই নেতাকে নিয়ে একটি সামরিক কার্গো বিমান দিল্লীর পথে উড়ে চলল। সাক্ষাতের সময় এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদ্বয়ের বেশভুষার করুণ অবস্থা দেখে রুস্তমজীর পক্ষ থেকে কিছু কাপড়, সেভিং কীট ও নোট নেয়ার জন্য কাগজ-কলম বিমানে আগেই পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। দিল্লীতে এই অতিথিদের বিএসএফ-এর রেস্ট হাউজে উঠান হয়। ২ এপ্রিল বিশ্রামের নামে স্বাভাবিকভাবেই তাদের পূর্ণ পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সব প্রকার গোয়েন্দা প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করা হয়। ৩ এপ্রিল সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাজউদ্দীন আহমদকে স্বাগত জানান। ওই দিন আলাপকালে তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতির একটি বাস্তব চিত্র জানার চেষ্টা করেন। আরও আলোচনার আশা নিয়ে অতিথিকে ওই দিনের মতো বিদায় জানান। সম্ভবত তখনও এক নাকি দুই পাকিস্তানের চয়েজ নিয়ে ভারতীয় নীতি নির্ধারকরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। ৫ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তাজউদ্দীন এবার শরণার্থীদের নিরাপত্তা, খাদ্য, বাসস্থানের ব্যবস্থা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, যুদ্ধ সরঞ্জাম যোগান, বঙ্গবন্ধুর প্রাণ রক্ষা, বাঙালী জাতির মনোবল অটুট রাখার জন্য একটি বেতার স্টেশনের ব্যবস্থা এবং মৃত পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলাদেশ সরকার গঠন ও ভারতের মাটিতে বসে তৎপরতা চালাতে সুযোগ দেয়ার দাবি জানান। ইন্দিরা গান্ধী তাকে আশ্বস্ত করেন।


ইতোমধ্যে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে শরণার্থীদের বাঁধভাঙ্গা ¯্রােত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রবেশ করছে, তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ হাই কমান্ডের সদস্য, প্রায় সকল এমএনএ-এমপিএও চলে এসেছেন। ব্যারিস্টার আমীরকে নিয়ে ভারত সরকারের দেয়া ছোট্ট একটি বিমানে ঘুরে ঘুরে তাজউদ্দীন সকলকে কলকাতায় জড়ো করেন। ৯ এপ্রিল তারা একটি নতুন সরকার গঠনের সিদ্ধান্তে উপনীত হলে ১০ তারিখ শিলিগুড়ি বেতার থেকে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীনের ভাষণের মাধ্যমে সবাই তা জানতে পারে। শত দুঃখ-কষ্ট ও প্রাণের ভয়ের মধ্যেও এই সংবাদে শরণার্থী শিবির, মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের ভেতর অবরুদ্ধ বাঙালীদের মনে আনন্দ বয়ে যায়। তারা আশার আলো দেখতে পায়।


বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের উদ্যোগ : ভারতের মাটিতে তৎপরতা হতে পারে ঠিকই; কিন্তু নতুন এই সরকারের শপথ অনুষ্ঠান নিজ মাতৃভূমিতে ১৭ এপ্রিল করার সিদ্ধান্ত থেকেই মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলাকে নির্বাচিত করা হয়। ১৬ এপ্রিল বিকেলে একটি দল রেকিতে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা, অপরটি কলকাতা প্রেসক্লাবের দিকে ছোটে। প্রেসক্লাবে হাজির হয়ে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, আঃ মান্নান এমএনএ এবং আমিনুল হক বাদশা পরদিন সূর্যোদয়ের পূর্বে এখানেই উপস্থিত এবং তাদের সঙ্গে লং ড্রাইভে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর সংগ্রহের আমন্ত্রণ জানান। কি সেই সুখবর! অতিমাত্রায় কৌতূহলী সাংবাদিকরা রাতের অন্ধকারের মধ্যেই প্রেসক্লাবে উপস্থিত হন। কিছুক্ষণ পর প্রায় চল্লিশটি গাড়ি ভরে গেল দেশী-বিদেশী সাংবাদিকে। তারা সত্যিকার অর্থে কোন লং ড্রাইভে নয়, বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননে হাজির। চর্মচক্ষু দিয়ে শপথ অনুষ্ঠান দেখে এই ঐতিহাসিক সংবাদটি ছড়িয়ে দিলেন বিশ্বে। এমন সৌভাগ্য হয় ক’জনের!


শপথ গ্রহণের পর সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে ছোট-বড় বিশটি কক্ষের কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে একটি দোতলা ব&#

User Comments

  • আরো